গণপ্রজাতন্ত্র এবং দাসত্ব

জনগণ যুদ্ধ করে, দেশ স্বাধিন হয়।
জনগণ ভোট দেয়, জনগণ স্বপ্ন দেখে,
সুখের সূর্য উঠবে।
জনগণ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে হালচাষ করে,
জনগণ পাতে ভাত পায় না।
জনগণ ঋণ পরিশোধ করে,
জনগণ সুদ ঘুষ দেয়, কাজের কাজ কিচ্ছু হয়না।
জনগণ এত সব করে,
শক্তিশালী হয় কিছু লোক যারা জনগণের সেবক।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জনগণ বিক্রিত এবং ভিখারি হয়েছে,
জনগণ তা জানে না,
গণপ্রজাতন্ত্র এবং দাসত্বের অর্থ জনগণ জানতেও চায় না।

‘জীবনাকাশের সূর্য’

[সাতাশ পদ]
আজ একটু গপসপ করতে চাই,
আপনাদের সময় আছে তো?
বিমনা মনে অনেক কষ্ট,
বুকের ভিতর আনচান আনচান ভাব,
জানি না কেন এ অস্থিরতা?
নির্জন নিরলায় যেয়ে বসতে চাই,
আত্মায় জমা কষ্ট নোনা জলে ভাসাতে,
সময় কি হবে?
জানেন, মানব জীবন সত্যি কৌতূহলোদ্দীপক।
ব্যাঙাচি আদলের শুক্র থেকে শুরু, শেষ হয় লম্বা হয়ে শোয়ে,
সত্য জেনে এবং বাস্তবতা দেখে আমি হতবাক!
চোখে রাজ্যের বিস্ময়,
সবকিছু কেমন যেন বুদ্ধির বার,
দিনরাত চিন্তা করেও আয়ত্তে আনতে পারি না,
বিমনা মনকে নিয়ে দায়ে ঠেকেছি।
গন্তব্য কোথায় জানি, পথ সত্যি অত্যন্ত দূর্গম,
জীবনাকাশের সূর্য মধ্যাকাশ পাড়ি দিয়েছে,
বেলা এখন ভাটি,
মন মাঝি বৈঠা তুলে গলুইয়ে লম্বা হয়ে শোয়ে বলছে,
তুই নাও বা।
আমি বিশ্বাস করি সবাই সুখ চায়,
বিফলতা বলতে কিছু নেই, আছে শুধু সফলতা,
সরল রেখায় আমাদের জীবন শুরু হয়,
পরে আস্তেধীর মোড় বদলে,
আম গাছে বসে কুটুম পাখিরা কুটুম কুটুম ডাকে,
কুটুমের মুখ এখন আর দেখা হয় না,
চিন্তায় আছি আমি চিন্তক হতে চাই না।

‘শখের কাজ’

[ঊনিশ পদ]
কবিতা হলো শখের কাজ,
পেশা বানাতে চাইলে সর্বনাশ হয়,
মাথা নষ্টের মন্ত্র হয়ে কবিতারা এখন স্বাধীন,
বাতাসে বসে গুনগুন করে গান গায়,
কউতররা দোলনায় বসে দুল খায়।
কবিদের হাবভাব বুঝি না,
কউতরের কল্লায় গুল্লি মেরে বলে, আজ কবিতা লিখব।
কবিতা লিখে কবিরা সফলও হচ্ছে,
তবে বেশির ভাগ অভাগা, পাতে ভাত পড়ে না,
কবি হতে হলে প্রশান্ত হতে হয়, কবিদের পেট পিঠ নেই।
কষ্টে ক্লিষ্ট হলে মন অতিষ্ট হয়,
সৎকর্মে স্বর্গ মিলে, অসৎরা নরকে যাবে,
কল্পনার কল্পনায় কাল্পনিক সব কল্পনা,
আঁধারের গল্প শুনলে ভয়ে কলিজা কাঁপে,
আজকাল জান ডাকলে জানরা ধমকায়।
অনন্তাকাশে মেঘ, পরিবেশ খুব সুন্দর,
জংলায় সোনার হরিণ থাকে,
চাইলে ধরা যায় না, তবে চাইলে পাপমোচন হয়,
শাপমোচন সহজে না হওয়ার কারণ মানুষের মনে দাগা লাগে।

শুক্রবার

অনেকে মনে করেন কিছু শব্দ ব্যবহারে জনপ্রিয় হওয়া যায়,
হয়তো সত্যি, কিন্তু তা পরে কলঙ্কের কালি হয়, আমি জেনেছি।
শুক্রবার পবিত্র দিন। অন্য দিনের মত নয়। তা শুধু ধার্মিকদের জন্য,
ধর্মাত্মারা শুক্রবারকে সম্মান করেন, অনেকে অশ্লীল শব্দে কবিতা লিখেন,
খুব ভালো, কিন্তু কী বুঝাতে চান আমি বুঝি না, কারণ আমি মুসলমান।
জানি এবং মানি আমি পাপের সাগরে ডুবেছি, তবুও শুক্রবারকে সম্মান করি,
শনিবার এবং রবিবারও পবিত্র, অন্য ধর্মের লোকরা অন্য দিন আরাধনা করেন।
ধর্মপালন এবং ভাব প্রকাশ সবার ব্যক্তিগত বিষয়, আমিও মতামত প্রবাশ করি,
শুধু বলব, কিছু শব্দে লজ্জিত হতে হয়, শুধু তাদের জন্য যাদের লজ্জা আছে।

আধুনিক কবিতা

সূর্যকে খাঁচায় বন্দি করতে চেয়ে আমি আয়নায় প্রবেশ করছিলাম,
খাঁচাটা আসলে বাঁশের ছিল, এটাই ছিল আমার মারাত্মক ভুল,
খাঁচার পাখিরা পুড়ে ছাই হলে সূর্যের তাপে পানি বাষ্প হয়েছিল,
ভাগ্যিস অন্ধকারে ছিলাম, দিনের ভিতর থাকলে আমিও ভস্ম হতাম।

সীমান্ত

সব কিছুর সীমা আছে, শুধু ভালোবাসা অসীম,
তা অনেকে বললেও আমি সত্যাসত্য জেনেছি,
আসলে সবকিছুর সত্যি সীমা আছে,
চাইলেও কানীনকে সবাই ভালোবাসতে পারে না।
ভালোবাসার সীমা পার হলে কলঙ্কিনীরা সকাল সকাল বেরোয়,
বিকেল বেলা দেরি করে বাসায় ফিরার কারণ কলঙ্কের সীমা আছে,
বিধায় চাইলেও কেউ কলঙ্কের চতুঃসীমার বাইরে যেতে পারে না।
আয়ূর সীমা পার হলে মৃত্যুর সাথে সাক্ষাৎ হয়,
দেহ নিথর হলে সীমার ভিতর সৎকার করতে হয়।
আকাশেরও সীমা আছে,
অসীম শুধু স্রষ্টা। কারণ, সীমাকে স্রষ্টা সৃষ্টি করেছেন।

উদাস মাঝি

ছুটি কাটাবার জন্য ফুটানিবাবু পাটন থেকে পাড়াগাঁ এসেছেন। পারঘাটে দাঁড়িয়ে ফাঁটফাঁটি শুরু করলে হঠাৎ পা পিছলে চিৎপটাং। বাবুর হাতে বৈঠা দিয়ে পাটনি পিটটান করে। বেচারা ফুটানিবাবু, সেই থেকে গলুইয়ে বসে দুঃখের বারোমাসি গায়।

এক ফাঁকিবাজ পারঘাটে পৌঁছে নতুন পাটনিকে দেখে চিন্তিত হয়। বকেয়ার খাতায় তার নাম একাধিকবার লেখা। নতুন পাটনির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, ‘অনাদায়ি টাকা দিয়ে আজ আমি বাঁশরি কিনব।’
পাটনি তখন স্বরগ্রাম চর্চা করছিল, ‘গ্রামিক হওয়ার জন্য গ্রামে এসে গ্রাম্য হয়েছি, গ্রামোফোনে গান শুনে গ্রামান্তরে পৌঁছেছি।’
মাঝিকে ডেকে ফাঁকিবাজ বলল, ‘ও উদাস মাঝি! আজ এত উদাস কেন?’
‘আমার সোনাবউ নাইয়র গিয়েছে। মন খালি আনচান আনচান। বুকের ভিতর টনটন উচাটন।’
‘কারবার শেষ! আজ আর কেউ বাজারে যেতে পারব না। গাঙ ভরা পানি। খালে বিলে শুশুক আছে। ধরতে পারলে কামড়িয়ে খাবে। ও মাঝি ভাই। আরে মিঞাভাই এপারে আসুন। আপনার সাথে গপসপ করতে চাই।’
‘আজ না বেনিয়া ভাই। পারলে কলাগাছের ভেলায় বসে বাজারে চলে যান। আমার সোনাবউ বেনারসির জন্য বায়না ধরেছে। আজ আর বউনি করব না।’
‘দৌড়ে এপারে আসুন, অনাদায়ি টাকা দিয়ে বিদেশি বেনারসি কিনে দেব। দাদার বান্ধবী আমার বউকে দাদনে কয়েকখান দিয়েছিলেন। দৌড়ে আসুন।’
‘আপনি হয়তো জানেন না, পাটব হওয়ার জন্য আমি পাটনাই গিয়েছিলাম। পাটিপত্র ঠিকঠাক করার জন্য পাটন থেকে পাটনি এসেছিল। বনিবনা না হলে লেনদেন চুকাবার জন্য কেউ পাটকেল মেরেছিল। সেই থেকে উদাস মাঝি হয়েছি।’
‘আজ আমি শেষ! বাজারে না গেলে পাটকাঠির বাড়ি একটাও মাটিতে পড়বে না। মাঝিভাই! তোমার হাতে পায়ে ধরি আমারে গাঙ পার করে দাও।’
‘আপনি নিশ্চয় জানেন, বিনয়ীরা বিনম্র বচনে ভাব প্রকাশ করে। আজ আমি বিনয়নে বিনয়ী হতে চাই।’
‘খাইছে আমারে। উদাস মাঝিকে আজ কবিতার ভূতে জেঁতেছে। ও মাঝভাই আমি বিশ্বাস করি আপনি বিনয়ী।’
‘ভাই গো, জাঁকের জা জাঁতা কিনে বেজুত হয়েছে, জাঁদরেল জহুরি জাঁকড়ে জাওলা বেচে পালিয়েছে।’
‘বুঝেছি ফক্কড়ের খপ্পরে পড়ে ফড়িঙ্গা আজ ফক্কিকা হয়েছে। মাঝিভাই, জীবনে আর ফক্কুড়ি করব না। আমাকে পার করে দাও। আমার গলার ফকরে মালা তোমাকে দান করব।’
‘আমাকে কিচ্ছু দিতে হবে, শুধুমাত্র একটি বার এই বৈঠার মুঠা ধরলে হবে।’
‘দূর যা! আমি আর গাঙ পার হব না।’
স্বত্ব মো.আ.হা