উদাস মাঝি

ছুটি কাটাবার জন্য ফুটানিবাবু পাটন থেকে পাড়াগাঁ এসেছেন। পারঘাটে দাঁড়িয়ে ফাঁটফাঁটি শুরু করলে হঠাৎ পা পিছলে চিৎপটাং। বাবুর হাতে বৈঠা দিয়ে পাটনি পিটটান করে। বেচারা ফুটানিবাবু, সেই থেকে গলুইয়ে বসে দুঃখের বারোমাসি গায়।

এক ফাঁকিবাজ পারঘাটে পৌঁছে নতুন পাটনিকে দেখে চিন্তিত হয়। বকেয়ার খাতায় তার নাম একাধিকবার লেখা। নতুন পাটনির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, ‘অনাদায়ি টাকা দিয়ে আজ আমি বাঁশরি কিনব।’
পাটনি তখন স্বরগ্রাম চর্চা করছিল, ‘গ্রামিক হওয়ার জন্য গ্রামে এসে গ্রাম্য হয়েছি, গ্রামোফোনে গান শুনে গ্রামান্তরে পৌঁছেছি।’
মাঝিকে ডেকে ফাঁকিবাজ বলল, ‘ও উদাস মাঝি! আজ এত উদাস কেন?’
‘আমার সোনাবউ নাইয়র গিয়েছে। মন খালি আনচান আনচান। বুকের ভিতর টনটন উচাটন।’
‘কারবার শেষ! আজ আর কেউ বাজারে যেতে পারব না। গাঙ ভরা পানি। খালে বিলে শুশুক আছে। ধরতে পারলে কামড়িয়ে খাবে। ও মাঝি ভাই। আরে মিঞাভাই এপারে আসুন। আপনার সাথে গপসপ করতে চাই।’
‘আজ না বেনিয়া ভাই। পারলে কলাগাছের ভেলায় বসে বাজারে চলে যান। আমার সোনাবউ বেনারসির জন্য বায়না ধরেছে। আজ আর বউনি করব না।’
‘দৌড়ে এপারে আসুন, অনাদায়ি টাকা দিয়ে বিদেশি বেনারসি কিনে দেব। দাদার বান্ধবী আমার বউকে দাদনে কয়েকখান দিয়েছিলেন। দৌড়ে আসুন।’
‘আপনি হয়তো জানেন না, পাটব হওয়ার জন্য আমি পাটনাই গিয়েছিলাম। পাটিপত্র ঠিকঠাক করার জন্য পাটন থেকে পাটনি এসেছিল। বনিবনা না হলে লেনদেন চুকাবার জন্য কেউ পাটকেল মেরেছিল। সেই থেকে উদাস মাঝি হয়েছি।’
‘আজ আমি শেষ! বাজারে না গেলে পাটকাঠির বাড়ি একটাও মাটিতে পড়বে না। মাঝিভাই! তোমার হাতে পায়ে ধরি আমারে গাঙ পার করে দাও।’
‘আপনি নিশ্চয় জানেন, বিনয়ীরা বিনম্র বচনে ভাব প্রকাশ করে। আজ আমি বিনয়নে বিনয়ী হতে চাই।’
‘খাইছে আমারে। উদাস মাঝিকে আজ কবিতার ভূতে জেঁতেছে। ও মাঝভাই আমি বিশ্বাস করি আপনি বিনয়ী।’
‘ভাই গো, জাঁকের জা জাঁতা কিনে বেজুত হয়েছে, জাঁদরেল জহুরি জাঁকড়ে জাওলা বেচে পালিয়েছে।’
‘বুঝেছি ফক্কড়ের খপ্পরে পড়ে ফড়িঙ্গা আজ ফক্কিকা হয়েছে। মাঝিভাই, জীবনে আর ফক্কুড়ি করব না। আমাকে পার করে দাও। আমার গলার ফকরে মালা তোমাকে দান করব।’
‘আমাকে কিচ্ছু দিতে হবে, শুধুমাত্র একটি বার এই বৈঠার মুঠা ধরলে হবে।’
‘দূর যা! আমি আর গাঙ পার হব না।’
স্বত্ব মো.আ.হা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *